ঢাকা বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬ , ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হোটেল বয় থেকে জিপিএ-৫ পেল বিশাল

অনলাইন ডেস্ক
১ দিন আগে
হোটেল বয় থেকে জিপিএ-৫ পেল বিশাল
ভিটেমাটির এক টুকরো জমিও নেই। অন্যের জমিতে ভাঙা চালাঘরে মাথা গুঁজে থাকা। সংসারের অভাব মোচন ও লেখাপড়ার খরচ জোগাতে দিনমজুরি, হোটেলে বয়ের কাজ, এমনকি টিউশনিও করেছেন। কিন্তু একমুহূর্তের জন্যও লক্ষ্যচ্যুত হননি বিশাল সরকার কৌশিক।

শত বাধা পেরিয়ে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় সব বিষয়ে এ প্লাসসহ জিপিএ-৫ পেয়েছেন তিনি। তবে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণে এখন তার সামনে বড় বাধা চরম দারিদ্র্য ও পরিবারের ঋণের বোঝা। ২টি এনজিও থেকে নেওয়া ঋণের সাপ্তাহিক কিস্তি ২ হাজার ৩০০ টাকা। সেই টাকা জোগাড় করাই কঠিন। ধারদেনা বাড়ছে, তাই সেরা ফলের আনন্দও ফিকে হয়ে গেছে বিশালের পরিবারের।

বিশাল সরকার কৌশিক কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে এ বছর বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছেন। পার্শ্ববর্তী কাঁঠালবাড়ী বিদ্যাকানন থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি পাওয়ার পর তিনি ভর্তি হন কুড়িগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে এসএসসিতে সব বিষয়ে এ প্লাসসহ জিপিএ-৫ পেয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন। এরপর চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দানা বাঁধতে শুরু করে। ভর্তি হন কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে। এবার ফলাফল বিপর্যয়ের মধ্যেও অন্ধকার ঘরে চাঁদের আলোর মতো জ্বলজ্বল করছে তার নাম।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ী ইউনিয়নের কাঁঠালবাড়ী বাজারের পাশে বিশালদের জীর্ণ কুটির। সরেজমিনে তার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছোটখাটো ৩টি ভাঙাচোরা চালাঘরে তাদের দুঃখের জীবন। পুরোনো টিনের চালে অসংখ্য ফুটো। বাঁশঝাড়ের এক কোণে খোলা রান্নাঘর।

বিশালের মা কণা রানী একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের আয়া। সামান্য সম্মানী পান তিনি। বাবা সুকুমার সরকার অসুস্থতা সত্ত্বেও পেটের দায়ে সপ্তাহে দুদিন হাটবারে খোলা জায়গায় টি-স্টল চালান। আয় সামান্য। এর মধ্যে সংসারের বোঝা আরও বড় হয়েছে ঋণের দায়ে।

অভাব আর ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে মা গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ৮০ হাজার টাকা ঋণ নেন। কিস্তি শোধ করার মতো আয় না হওয়ায় বেসরকারি সংস্থা আশা থেকে আরও ৩০ হাজার টাকা ঋণ নেন। সপ্তাহে ২ হাজার ৩০০ টাকার কিস্তির ভার সইতে না পেরে আরও ৫০ হাজার টাকা ধার করেন। এভাবেই ঋণের জালে জড়িয়ে সহায়-সম্বলহীন পরিবারটি ধুঁকছে। বড় ছেলে কর্ণ সরকার টিউশনি করিয়ে নিজের পড়ালেখার খরচ জোগান। আর বিশালের সাফল্যের পথে রয়েছে সংগ্রাম ও বেদনার নানা গল্প।

শিক্ষার্থী বিশাল সরকার কৌশিক জানায়, স্কুলে ভর্তির পর বন্ধুর দেওয়া পুরোনো প্যান্ট আর জুতা দিয়েই শুরু হয় আমার স্কুলজীবন। নবম শ্রেণি পর্যন্ত অর্থাভাবে কোনো প্রাইভেট টিউশনি পড়তে পারিনি। পরে কয়েকজন শিক্ষক আমাকে বিনা মূল্যে পড়ান। একইভাবে এইচএসসিতেও প্রবাসী এক ব্যক্তির সহায়তাসহ শিক্ষকদের সহযোগিতায় আমার স্বপ্নের পথে যাত্রা অব্যাহত থাকে।

সে আরও জানায়, অটোর ভাড়ার অভাবে অনেক দিন স্কুল ও কলেজে যাওয়া হয়নি। সারাদিন অভুক্ত থেকেছি। চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হই। কিন্তু খরচ দিতে পারছিলেন না আমার বাবা। এবারও কয়েকজন শিক্ষক আমাকে বিনা ফিতে টিউশনি পড়ান।

প্রাইভেট শিক্ষক ডা. নন্দন কুমার দেব বলেন, বিশাল একজন মেধাবী শিক্ষার্থী। আমি তাকে বায়োলজি পড়াতাম। সে খুবই মেধাবী। যদি লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারে, তাহলে তার আশা পূরণ করতে পারবে। আমি আশীর্বাদ করছি, সে বড় একজন ডাক্তার হোক।

কাঁঠালবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. রোস্তম আলী বলেন, বিশালের বাবা একজন দরিদ্র মানুষ। তাদের পরিবারের অবস্থা খুব খারাপ। ছেলেটি হোটেলে বয়ের কাজ করে লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছে।

প্রতিবেশী আলমগীর হোসেন বলেন, বিশাল একজন মেধাবী শিক্ষার্থী। তার পরিবার অনেক কষ্টে চলছে। সরকার ও বিত্তবান মানুষ এগিয়ে এলে বিশাল তার স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে।

বিশালের বাবা সুকুমার সরকার জানান, তার তিন ছেলেমেয়েই মেধাবী। সড়কের ধারে ছোট একটি টি-স্টল ছিল। ২০২০ সালে ঘরবাড়ি উচ্ছেদের সঙ্গে সেটিও উচ্ছেদ হয়। এরপর এক প্রতিবেশীর সুপারি বাগানে মাথা গুঁজে আছেন তারা।

বিশালের বড় ভাই কর্ণ সরকার কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে অনার্সে পড়েন। তিনি জানান, চরম অভাব-অনটনের মধ্যেও ছোট ভাইয়ের সেরা ফলাফলে আনন্দের বদলে কান্না এসেছিল। তার স্বপ্ন কীভাবে পূরণ হবে, সেটিই এখন পরিবারের সবার দুশ্চিন্তার কারণ।

মা কণা রানী জানান, ২ জনের সামান্য আয়ে সংসারের খরচ মেটে না। তার ওপর রয়েছে ঋণ। এ অবস্থায় ছেলের স্বপ্ন পূরণে লেখাপড়ার খরচ জোগানোর কোনো উপায় দেখছেন না তিনি। কোনো হৃদয়বান মানুষ এগিয়ে এলেই কেবল ছেলেটির আশা পূরণ হবে বলে জানান কণা রানী।





কমেন্ট বক্স